বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর - দশম শ্রেণি বাংলা | Bohurupi Golper Question Answer Class 10 Bengali

বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর - দশম শ্রেণি বাংলা | Bohurupi Golper Question Answer Class 10 Bengali

বহুরূপী গল্পের প্রশ্ন উত্তর

১। ছোটোগল্প হিসেবে 'বহুরূপী' কতদূর সার্থক, তা আলোচনা করো। 

ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য

সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা ছোটোগল্প কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ছোটোগল্পের আয়তন হয় সংক্ষিপ্ত, চরিত্রসংখ্যা কম, ঘটনার জটিলতা কম, বিষয় একমুখী ও তীব্রগতিসম্পন্ন এবং অন্তিমে থাকে একটা 'শেষ ছোটোগল্পের বৈশিষ্ট্য হয়ে হইল না শেষ'-এর অতৃপ্তিজনিত অন্তর্চমক। আধুনিক কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্পটি এই বৈশিষ্ট্যসমূহের নিরিখে ছোটোগল্প হিসেবে কতদূর সার্থক হয়েছে, তা আলোচনা করা যেতে পারে।

ছোটোগল্প হিসেবে সার্থকতা বিচার

'বহুরূপী' গল্পটির আয়তন তুলনায় সংক্ষিপ্ত। নায়ক হরিদাকে কেন্দ্র করে জগদীশবাবু, গল্পকথক, অনাদি, ভবতোষ ও হিমালয়ের সন্ন্যাসী গল্পের কাহিনিকে পরিণতির অভিমুখে টেনে নিয়ে গিয়েছে। কাহিনিতে ঘটনার জটিলতা তেমন নেই। বহুরূপী হরিদা তার দারিদ্র্যপীড়িত জীবনেও কীভাবে বহুরূপীর পেশাদারিত্বে জনমনোরঞ্জন করে চলেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে এই গল্পে। এই প্রসঙ্গে এসেছে হিমালয় থেকে জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত এক সন্ন্যাসীর উপকাহিনি। অনাদির মুখে হরিদা এই ঘটনা শুনে নিজেও 'জবর খেলা' দেখিয়ে 'মারি তো হাতি, লুটি তো ভান্ডার' করতে চেয়েছেন। যদিও ঘটনা পরম্পরায় দেখা যায়, শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠ থাকার দরুন বিরাগীরূপী হরিদা বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া গল্পের শেষে গল্পকথক ও তার বন্ধুদের কাছে হরিদা যেভাবে আবারও জগদীশবাবুর বাড়ি গিয়ে বকশিশস্বরূপ সামান্য পয়সা চাইতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন, সেখানেই লুকিয়ে আছে গল্পের অন্তর্চমক। প্রণামিস্বরূপ একশো এক টাকা অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করে হরিদার এই সামান্য পয়সা বকশিশ চাওয়ার ইচ্ছে পাঠককে নতুন ভাবনায় ভাবিত করে। তাই গল্পপাঠের পরেও গল্পের মূল সুর পাঠকমনে অনুরণিত হয়। ছোটোগল্পসুলভ এইসব বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে 'বহুরূপী' গল্পটি সার্থক ছোটোগল্পে পরিণত হয়েছে।

২। 'বহুরূপী' গল্পে হরিদার চরিত্রটি আলোচনা করো।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা।

বন্ধুবৎসলতা

হরিদা দরিদ্র, সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। শহরের সবচেয়ে সরু গলির প্রান্তে একটি ঘরে তাঁর মাথা গোঁজার বন্ধু করে নেওয়ার ঔদার্য তার চরিত্রে আছে। ঠাঁই। কিন্তু তিনি বন্ধুবৎসল। 

শিল্পীমনস্কতা

পেশাগতভাবে হরিদা বহুরূপী। সপ্তাহে একটা দিন বহুরুপী সেজে যে অর্থোপার্জন হয়, তাতে তাঁর সাত দিনের ক্ষুধানিবৃত্তি হয় না। কিন্তু ঘড়ি ধরে চলা বা সময় বাঁধা জীবন মানতে তাঁর তীব্র আপত্তি। এখানেই তার শিল্পীসুলভ মানসিকতার প্রকাশ। 

সহজসরল জীবনযাপন

সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্ত হরিদা, সমাজের ওঠা-নামা বা শ্রেণিকৌলীন্য কোনোটিতেই আগ্রহী নন। সমাজও তাঁকে মানুষের সম্মান খুব একটা দেয় না। তাই তিনি বলেন-'না রে ভাই, বড়ো মানুষের কাণ্ডের খবর আমি কেমন করে শুনব? আমাকে বলবেই বা কে?'

বহুরূপী জীবন

হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য তার বহুরূপের পেশাদারিত্ব। বহুরূপ ধারণে তিনি দক্ষ শিল্পী। সাজের নৈপুণ্যে, অভিনয়ের চমৎকারিত্বে জনমনে তিনি বিশ্বাস তৈরি করার ক্ষমতা রাখেন।

আদর্শবোধ

বৈরাগীবেশে হরির আচরণ প্রকৃতার্থে একজন শিল্পীর আচরণ। এখানেই তার সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব। শিল্পই হরির জীবনের একমাত্র সত্য। শিল্পের জন্যই শিল্পীর সর্বসত্তা নিবেদিত। শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং সততায় তিনি সন্ন্যাসী বেশধারণ করে অর্থোপার্জন করতে পারেন না। এই ঘটনায় হরিদার জীবনের গভীর আদর্শবোধ স্পষ্ট হয়।

৩। জগদীশবাবুর বাড়ি হরিদা বিরাগী সেজে যাওয়ার পর যে ঘটনা ঘটেছিল, তা বর্ণনা করো। (মাধ্যমিক, ২০১৭) 

অথবা, হরিদার বিরাগী ছদ্মবেশের পরিচয় দাও। 

হরিদার বিরাগী সাজ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা শহরের এক জ্যোৎস্নালোকিত স্নিগ্ধ ও শান্ত সন্ধ্যায় বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হন। হরিদা তার পেশাগত নৈপুণ্যে বিরাগীর বেশধারণের উদ্দেশ্যে আদুড় গায়ে ধবধবে সাদা উত্তরীয় এবং ছোটো বহরের সাদা থান পরেছিলেন। কোনো জটাজুটধারী গৈরিকবেশী সন্ন্যাসীর মতো হরিদার হাতে কমণ্ডলু বা চিমটে ছিল না। তাঁর মাথায় শুকনো সাদা চুল ফুরফুর করে উড়ছিল, আর ধুলো মাখা পা, কাঁধে ছিল একটা ঝোলা। হরিদার এই প্রকৃষ্ট বিরাগী রূপ জগদীশবাবুকে চমকে দিয়েছিল। তাঁর শীর্ণ চেহারা অশরীরী হয়ে উঠেছিল সেদিন। আর তাঁর দৃষ্টিতে ছিল শান্ত উজ্জ্বল ভাব।

জগদীশবাবুর বাড়ির ঘটনা

বিরাগীর ছদ্মবেশধারী হরিদার অতর্কিত ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতিতে বিস্মিত জগদীশবাবু স্বস্থানে স্থির থাকলে হরিদা বলেন, অর্থের অহংকারেই তিনি হয়তো নিজেকে ভগবানের চেয়ে বড়ো বলে মনে করেছেন। এই কথার উত্তরে জগদীশবাবু তাকে রাগ করতে বারণ করলে হরিদা বলেন বিরাগীর চরিত্রে কোনো রিপুর অস্তিত্ব নেই। জগদীশবাবু তাঁর বাড়িতে বিরাগীজিকে থাকতে অনুরোধ করেন। তখন হরিদা বলেন বিপুলা এই পৃথিবীর মাটিতেই তার স্থান। জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদা কোনো কিছু স্পর্শ না করে কেবলমাত্র জলগ্রহণ করেন। অর্থের মোহ কেবল একটি বঞ্চনা, তাই সন্ন্যাসীরূপী হরিদা জগদীশবাবুকে সেই এককের সাধনা করতে বলেন, যিনি সমগ্র সৃষ্টির কর্তা।

হরিদার সাজসজ্জা, কথনভঙ্গি এবং ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতিতে মুগ্ধ হয়ে জগদীশবাবু তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকার একটি থলি দেন। কিন্তু সন্ন্যাসব্রত অনুযায়ী নিরাসক্ত হরিদা ধুলো মাড়িয়ে যাওয়ার মতো এই অর্থও অনায়াসে মাড়িয়ে যেতে পারেন। এভাবেই হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে নিষ্ঠা ও শিল্পগত আদর্শে এক প্রকৃত সন্ন্যাসীর চরিত্রকেই উপস্থাপন করেন।

৪। "বাঃ, এ তো বেশ মজার ব্যাপার।"-বক্তা কে? কোন্ প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেছেন? মজার বিষয়টি নিজের ভাষায় বিবৃত করো।

বক্তা

কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা গল্পের নায়ক হরিদা।

প্রসঙ্গ

জগদীশবাবুর বাড়িতে আতিথ্যগ্রহণকারী সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো কৌশলে সংগ্রহ করার ঘটনা শুনে, সেই প্রসঙ্গে হরিদা উদ্ধৃত কথাটি বলেছিলেন।

সন্ন্যাসীর পরিচয়

শহরের ধনী ব্যক্তি জগদীশবাবুর বাড়িতে হিমালয় থেকে আগত একজন সন্ন্যাসী আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন 'খুব উঁচু দরের সন্ন্যাসী'। হিমালয়ের গুহায় তিনি বাস করেন। বছরে একটিমাত্র হরীতকী খেয়ে জীবনধারণ করেন। অনেকের মতে, তাঁর বয়সও হাজার বছরেরও বেশি।

সন্ন্যাসীর পদধূলি সংগ্রহ

সন্ন্যাসী চলে গিয়েছেন শুনে হরিদা আক্ষেপ করে বলেন যে, সন্ন্যাসী থাকলে তার পায়ের ধুলো তিনি নিতেন। তখনই জানা যায়, সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো 'ভয়ানক দুর্লভ জিনিস।' কেউই সেই সন্ন্যাসীর ধুলো নিতে পারে না। জগদীশবাবু কৌশলে একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেন। সন্ন্যাসী সেই খড়ম পরার জন্য পা বাড়িয়ে দিলে জগদীশবাবু সেই ফাঁকে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো সংগ্রহ করে নেন।

মজার ব্যাপার বলার কারণ

একজন সংসারত্যাগী, বিষয়বিমুখ সন্ন্যাসীর সোনার বোল লাগানো খড়ম দেখে নিজের সংযম হারিয়ে ফেলার বিষয়টিকে হরিদা 'মজার ব্যাপার' বলে অভিহিত করেছিলেন। 

৫। "গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা।"-গল্পটি নিজের ভাষায় লেখো। গল্প শুনে হরিদা গম্ভীর হলেন কেন? ৩+২

সন্ন্যাসীর গল্প

বিশিষ্ট সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরুপী' গল্পে উল্লিখিত শহরের ধনী মানুষ জগদীশবাবুর বাড়িতে হিমালয় থেকে আগত একজন উঁচুদরের সন্ন্যাসী আতিথ্যগ্রহণ করেন। হাজার বছরেরও বেশি বয়সি সেই সন্ন্যাসীর বাস হিমালয়ের গুহায় এবং সারাবছরে তার খাদ্য বলতে একটিমাত্র হরীতকী। সর্বত্যাগী সেই সন্ন্যাসী কাউকে পায়ের ধুলো নিতে দিতেন না। কিন্তু জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলে সন্ন্যাসী তা পরার জন্য পা বাড়িয়ে দেন। সেই ফাঁকে জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো সংগ্রহ করে নেন। শুধু তাই নয়, বিদায়বেলায় জগদীশবাবু সেই সন্ন্যাসীর ঝোলায় একশো টাকার একটা নোট জোর করে দিয়ে দেন। বিষয়বিমুখ সন্ন্যাসী সেই দানও সহাস্যে গ্রহণ করেন। গল্পকথক ও তার বন্ধুরা হরিদাকে এই গল্পই বলেছিল।

হরিদার গম্ভীর হওয়ার কারণ

দরিদ্র বহুরূপী হরিদার সংসারে অভাব ছিল তীব্র। বিচিত্র ছদ্মবেশ ধারণে জনমনোরঞ্জন করলেও তার উপার্জন সারা সপ্তাহের অন্নসংস্থানের তেমন উপযোগী ছিল না। তাই আদ্যন্ত নির্লোভহরিদার মধ্যে এই গল্প শুনে সাময়িক বিচ্যুতি দেখা দিয়েছিল। বহুরূপীর পেশাদারিত্বে সন্ন্যাসীর সাজে জগদীশবাবুকে মুগ্ধ করে অর্থোপার্জনের কথা ভাবতে ভাবতেই হরিদা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন।

৬। "হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না।"- কথাটির প্রেক্ষিতে হরিদার দারিদ্র্যপীড়িত জীবনযাত্রার পরিচয় দাও।

ভূমিকা

বৈচিত্র্যময় জীবনের সার্থক রূপকার কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' ছোটোগল্পে প্রধান চরিত্র হরিদার দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের চিত্র বর্ণিত হয়েছে।

বন্ধুদের জানা দারিদ্র্যকথা 

লেখক ও তার বন্ধুরাও হরিদার এই দারিদ্র্যের সঙ্গে সম্যক পরিচিত। শহরের সবচেয়ে সরু গলির ছোটো ঘরে হরিদার বাস। গল্পকথক ও তার বন্ধুরা হরিদার সঙ্গে চায়ের আড্ডায় বসলে নিজেরাই চা-চিনি-দুধ নিয়ে আসতেন।

পেশা

গল্পের নায়ক হরিদা পেশায় বহুরূপী। কিন্তু বহুরূপী সেজে তার অর্থ উপার্জন তেমন হয় না। যদিও হরিদা শিল্পীসুলভ নেশার টানে কখনও পাগল, বাউল বা কাপালিক সাজেন, কখনও বা সাজেন বুড়ো কাবুলিওয়ালা, পুলিশ বা রূপসি বাইজি। পরিচিতরা তার এই বহুরূপীর সাজে মুগ্ধ হলে এক আনা বা দু-আনা বকশিশ দেয়। অপরিচিতরা বিরক্তির সঙ্গে হাতে তুলে দেয় দুটো-একটা পয়সা। সপ্তাহের একটা দিনের এই সামান্য রোজগারে হরিদার সংসারের দুঃসহ অভাব ঘোচে না। সারা সপ্তাহের ক্ষুধানিবৃত্তির অন্নসংস্থান হয় না। তাই "হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না।"

৭। "হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।"-বহুরূপী হরিদার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যেভাবে নাটকীয় বৈচিত্র্য ধরা পড়েছে, তার বিবরণ দাও।

ভূমিকা

'বহুরূপী' গল্পের লেখক সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা চরিত্রটির জীবনের বর্ণময় অভিজ্ঞতা চরিত্রটিকে বৈচিত্র্যমণ্ডিত করেছে।

একঘেয়ে কাজে আপত্তি

হরিদার জীবনে দারিদ্র্য চরম। কিন্তু কোনো অফিসের কাজ বা দোকানের বিক্রিওয়ালার কাজে তিনি অন্তর থেকে বাধা পান। নিয়ম করে রোজ একই চাকরি করতে যাওয়ার একঘেয়েমি তার পছন্দ নয়। তাই তার উনুনের হাঁড়িতে বেশিরভাগ সময় ভাতের বদলে জল ফোটে। তবু বহুরূপী পেশার শিল্পগত আনন্দ তিনি হৃদয় দিয়ে উপভোগ করেন।

বহুরূপীর পেশা

হরিদার বহুরূপীর পেশাই তার জীবনে নাটকীয় বৈচিত্র্য আনে। কখনও তিনি উন্মাদ পাগল সেজে চকের বাসস্ট্যান্ডে 'আতঙ্কের হল্লা' বাজিয়ে তুলেছেন। আবার কখনও বা রূপসি বাইজি সেজে ঘুঙুরের মিষ্টি শব্দ তুলে সকলকে মোহিত করে তুলেছেন। কিংবা কখনও পুলিশ সেজে আটক ছাত্রদের মুক্ত করতে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকেও আট আনা ঘুষ আদায় করেছেন।

নাটকীয়তার চরম নিদর্শন

হরিদা নাটকীয়তার চরম নিদর্শন দেখিয়েছেন কাহিনির শেষে পৌঁছে। জগদীশবাবুর বাড়িতে 'জবর খেলা' দেখাতে গিয়ে তিনি বৈরাগী সন্ন্যাসী সেজে সকলকে বিস্মিত করে অভিনব চমক সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু হরিদা হাত পেতে জগদীশবাবুর দান গ্রহণ করেননি। শিল্পীর অহংকারে যে হরিদা এভাবে অবহেলায় জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানি উপেক্ষা করেন, তাকেই আবার দেখা গিয়েছে পরদিন জগদীশবাবুর বাড়ি গিয়ে বকশিশ আদায়ের কথা ভাবতে। এখানেই চরিত্রটির নিজস্ব দ্বন্দ্বের নাটকীয় পরিণতি পাঠককে নতুন ভাবনায় ভাবিত করে তোলে।

৮। "এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।”-হরিদার সৃষ্ট দুটি চমৎকার ঘটনার বিবরণ দাও। মানুষের মনে ওই ঘটনা দুটি কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল, তা নিজের ভাষায় লেখো। ৩+২

ভূমিকা

জীবনরসিক লেখক সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' গল্পে বহুরূপী হরিদা বিভিন্নরূপে নানা চমৎকার ঘটনার সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে একটি তার উন্মাদ সাজ আর-একটি পুলিশের সাজ।

প্রথম ঘটনা

একদিন দুপুরবেলা চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা 'আতঙ্কের হল্লা' বেজে উঠতে দেখা যায়। সকলের চোখে পড়ে, একটা বদ্ধপাগল থান ইট হাতে নিয়ে বাসের যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। পাগলটার মুখ থেকে ঝরে পড়ছিল লালা। তার কটকটে লাল চোখ, কোমরে জড়ানো ছেঁড়া কম্বল এবং গলায় টিনের কৌটোর একটা মালা। এই পাগলই ছিল হরিদা।

দ্বিতীয় ঘটনা

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল দয়ালবাবুর লিচুবাগানে। সেখানে পুলিশ সেজে হরিদা স্কুলের চারটে ছেলেকে আটক করেন। ছেলেগুলো ভয়ে কেঁদে ফ্যালে। স্কুলের মাস্টারমশাই ক্ষমা চান। কিন্তু তাতেও রক্ষে নেই। শেষে আট আনা ঘুষ খেয়ে নকল পুলিশ সাজা হরিদা ছেলেগুলোকে ছেড়ে দেন।

প্রথম ঘটনার প্রতিক্রিয়া

উন্মাদ পাগলরূপী হরিদাকে দেখে প্রথমে যাত্রীরা কেউ কেউ ভয়ে চেঁচিয়ে উঠে দুটো একটা পয়সা ফেলে দেয়। তারপর ছদ্মবেশী হরিদাকে চিনতে পেরে বাসের ড্রাইভার কাশীনাথ ধমকে দিলেও বাসের যাত্রীরা কেউ বিরক্ত হয়, কেউ মুগ্ধ হয়ে হাসে, আবার কেউ বিস্মিত হয়। প্রশংসাসূচক মন্তব্যও করে তারা- 'সত্যিই, খুব চমৎকার পাগল সাজতে পেরেছে তো লোকটা'।

দ্বিতীয় ঘটনার প্রতিক্রিয়া 

দ্বিতীয় ঘটনায় মাস্টারমশাই পরে জানতে পেরেছিলেন যে, বহুরূপী হরিদা নকল পুলিশ সেজে তার কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেছেন। যদিও তিনি এ ঘটনায় রাগ করেননি। বরং তারিফ করে বলেছিলেন-'সত্যি, খুব চমৎকার পুলিশ সেজেছিল হরি!'

৯। "অথচ আপনি একেবারে খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো সব তুচ্ছ করে সরে পড়লেন?"-কার কথা বলা হয়েছে? তিনি কীভাবে 'খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো' ব্যবহার করেছিলেন সংক্ষেপে আলোচনা করো। (মাধ্যমিক, ২০২২) ১+৪

সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশে হরিদার কথা বলা হয়েছে।

'খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো' ব্যবহার

হরিদা এক সন্ধ্যায় বিরাগী সাজে জগদীশবাবুর বাড়িতে হাজির হন। বিরাগীরূপী হরিদাকে দেখে জগদীশবাবু ও তার বন্ধুদের মনে হয়েছে তিনি যেন এই পৃথিবীর সীমার ওপার থেকে হেঁটে আসছিলেন প্রায় অশরীরীর মতো। জগদীশবাবু বিরাগী সন্ন্যাসীর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ এবং ভক্তিতে গদগদ হন। বিরাগীরূপী হরিদা অর্থমোহে আচ্ছন্ন জগদীশবাবুর মানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, "আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?” আবার জগদীশবাবুর মুখে 'মহারাজ' সম্বোধন শুনে হরিদা আত্মসমালোচনা করে বলেন যে, সে বিশ্বসৃষ্টির মাঝে এককণা ধূলি ছাড়া আর কিছুই নয়।

বিরাগীরূপী হরিদার কাছে পরম সুখের অর্থ সমস্ত সুখের মোহবন্ধন থেকে মুক্তি। এ কথা শুনে জগদীশবাবু অভিভূত হয়ে যান। "আমি বিরাগী, রাগ নামে কোনো রিপু আমার নেই। ছিল একদিন, সেটা পূর্বজন্মের কথা।"-বিরাগীর বেশধারী হরিদা এই কথার মধ্য দিয়ে সন্ন্যাসজীবনের সারসত্যকে তুলে ধরেছেন। আবার জগদীশবাবুর কাছে কয়েকটি দিন থাকার 'প্রাণের অনুরোধটিও হরিদা নাকচ করে বলেন যে, বাইরের খোলা আকাশ ও ধরিত্রীর মাটির বিশালতায় স্থান থাকতে তিনি কোনো বিষয়ীর দালানবাড়িতে আশ্রয় নেবেন না। ধন-জন-যৌবন সবই অস্থায়ী এবং এক-একটা সুন্দর বঞ্চনা মাত্র। এইসব কথার মধ্যে তার প্রকৃত সন্ন্যাসীসত্তা জাগরিত হয়। বহুরূপী হরিদা দরিদ্র হলেও শিল্পীসত্তা তার মজ্জাগত। তাই তিনি জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা প্রণামিও তুচ্ছজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করে চলে আসেন অবলীলায়।

১০। "অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।”-হরিদা কী ভুল করেছিলেন? অদৃষ্ট ক্ষমা না করার পরিণাম কী? (মাধ্যমিক, ২০১৯) ৩+২

ভুল

সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়ি গিয়েছিলেন। কিন্তু শিল্পের প্রতি সততায়, তার বৈরাগী সাজের সার্থকতার জন্য তিনি চরম দারিদ্র্যেও জগদীশবাবুর থেকে একশো এক টাকা প্রণামি গ্রহণ করেননি। তার এই নির্মোহ আচরণকেই উদ্ধৃতাংশে ভুল বলা হয়েছে।

পরিণাম

হরিদা হতদরিদ্র। দারিদ্র্যের চরম সীমায় দাঁড়িয়ে প্রায়ই তার ভাতের হাঁড়িতে শুধু জল ফুটে যায়। কিন্তু শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতায় হরিদা অর্থের প্রতি নির্মোহ থাকেন। তাই জগদীশবাবুর বাড়িতে তিনি তার প্রাপ্য প্রণামির অর্থ ফিরিয়ে দেন। এ কারণে তাঁর সঙ্গীদের মনে হয় দরিদ্র জীবনে অর্থাগমের সম্ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করায় অদৃষ্টে পরিণাম লেখা থাকবে। সেই পরিণতিতে হরিদার দরিদ্রতা চিরকালীন হয়ে যাবে।

৩ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

১। "সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস" - কোন্ জিনিসের কথা বলা হয়েছে? তা দুর্লভ কেন? (মাধ্যমিক, ২০২০) ১+২

সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' ছোটোগল্পে বর্ণিত জগদীশবাবুর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণকারী সন্ন্যাসীর পদধূলিকেই 'সে' বলে বোঝানো হয়েছে।

দুর্লভ বলার কারণ

'দুর্লভ' শব্দটির অর্থ যা অতিকষ্টে পাওয়া যায়; বা দুষ্প্রাপ্য। প্রকৃতার্থে সহজে লাভ করা যায় না বলেই তা দুষ্প্রাপ্য বা মহামূল্য হয়ে ওঠে। সন্ন্যাসীর পদধূলি দুর্লভ কারণ তা অতিকষ্টে পাওয়া যায়। আবার তার পদধূলি এ গল্পে আক্ষরিক অর্থেই মহামূল্য কারণ, তা পাওয়ার জন্য সোনার বোল দেওয়া কাঠের খড়ম উপহার দিতে হয়।

২। গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা!"- কোন্ গল্প শুনে হরিদা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন?

'বহুরূপী' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদাকে গল্পকথক একদিন জগদীশবাবুর অভিনব কান্ডের কথা বলেছিলেন। ধনবান জগদীশবাবুর বাড়িতে হিমালয়ের গুহানিবাসী এক উঁচুদরের সন্ন্যাসী সাত দিনের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। সেই সন্ন্যাসী সারাবছরে শুধু একটি হরীতকী ছাড়া আর কিছু খান না। সন্ন্যাসীর দুর্লভ পদধূলি গ্রহণ করার জন্য জগদীশবাবু তাকে সোনার বোল দেওয়া খড়ম পরানোর সময় কৌশলে তার পদধূলি গ্রহণ করেন এবং বিদায়দানকালে তার ঝোলায় জোর করে একটি একশো টাকার নোট ফেলে দেন। এ গল্প শুনেই হরিদা গম্ভীর হয়ে যান।

৩। "ঠিক দুপুরবেলাতে একটা আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল"-কোথায় হল্লা বেজে উঠেছিল? 'আতঙ্কের হল্লা' বেজে ওঠার কারণ কী? ১+২

সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্পে বর্ণিত 'আতঙ্কের হল্লা' বেজে ওঠে শহরে চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে।

'বহুরূপী' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদার পেশা ছিল বহুরূপী সেজে লোকের মনোরঞ্জন করা। একদিন দুপুরবেলা চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে হরিদা পাগল সেজে আবির্ভূত হন। সেই বদ্ধপাগলের মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছিল। তার চোখ দুটো ছিল কটকটে লাল। তার কোমরে জড়ানো ছিল একটা ছেঁড়া কম্বল। গলায় ঝুলছিল টিনের কৌটোর একটা মালা। সেই বন্ধপাগল একটা থান ইট তুলে বাসে বসা যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল। এসব দেখেই 'আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল।'

৪। "হরির কাণ্ড!”-এখানে হরির কোন্ কাণ্ডের কথা বলা হয়েছে? কাণ্ডটার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। ১+২

এক সন্ধ্যায় বহুরূপী হরিদার রূপসি বাইজি সেজে শহরের পথে পথে ভ্রমণের বিষয়কেই 'হরির কাণ্ড' বলা হয়েছে।

বহুরূপী হরিদার সাজ শহরের জীবনে মাঝে মাঝে চমৎকারিত্বের সৃষ্টি করত। একদিন সন্ধেবেলা যখন সবেমাত্র আলো জ্বলে উঠেছে, দোকানে দোকানে লোকজনের ব্যস্ততা আর মুখরতাও জমে উঠেছে তখন হঠাৎ পথের উপর দিয়ে ঘুঙুরের মিষ্টিমধুর শব্দে এক রূপসি বাইজি নাচতে নাচতে যাচ্ছিল। কৌতূহলী নাগরিককে দেখে এক-একটা দোকানের সামনে গিয়ে সে দাঁড়ায়, মুচকি হাসে আর চোখ টিপে একটা ফুলসাজি এগিয়ে দেয়। দোকানদারও হেসে ফেলে একটা সিকি বাইজির হাতের ফুলসাজিতে দেয়। শহরের নবাগতরা অবাক হয়ে এ দৃশ্য দেখলেও পুরোনো দোকানদার হরিদাকে চিনতে পেরে হেসেছিল।

৫। হরিদা পুলিশ সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন? তিনি কীভাবে মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়েছিলেন? (মাধ্যমিক, ২০১৭) ১+২

হরিদা পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভিতরে দাঁড়িয়েছিলেন।

বহুরূপী হরিদা পুলিশ সেজে স্কুলের চারটে ছেলেকে ধরেছিলেন। ছেলেগুলো ভয়ে কেঁদে ফ্যালে। হরিদা তার সাজের বিশ্বাসযোগ্যতায় সুনিপুণভাবে মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়েছিলেন।

৬। "এবার মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার।”-এ কথা কে, কাকে বলেছে? এমন মন্তব্যের কারণ কী? ১+২

সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' গল্পের গল্পকথককে বহুরুপী হরিদা প্রশ্নে উদ্ধৃত কথাটি বলেছেন।

সারাদিন ছদ্মরূপ ধরে ঘুরে বেড়ালেও হরিদার দু-তিন টাকার বেশি রোজগার হত না। সপ্তাহে একদিন বহুরুপী সেজে পথে বেরোনোর সামান্য রোজগারে সংসার চলত না তাঁর। এজন্য হরিদা চেয়েছিলেন ধনী জগদীশবাবুর বাড়িতে বহুরুপী সেজে মোটা টাকা রোজগার করবেন। সেই প্রসঙ্গেই প্রশ্নে উল্লিখিত মন্তব্যটি করা হয়েছিল।

৭। "বড়ো চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা।” গল্পে উল্লিখিত সন্ধ্যার নৈসর্গিক রূপের বর্ণনা দাও।

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্পে নাটকীয় মোড় ঘোরানোর পূর্বমুহূর্তে লেখক সুবোধ ঘোষ সন্ধ্যার অসাধারণ এক নৈসর্গিক চিত্রকল্পের বর্ণনা দিয়েছেন।

গল্পে উল্লিখিত সন্ধ্যার শহরে চাঁদের জ্যোৎস্নার মধ্যে ছিল স্নিগ্ধ ও শান্ত এক উজ্জ্বলতা। বাতাস সেই জ্যোৎস্নাকে সঙ্গ দিতেই যেন নিজের গতিকে করেছিল মন্থর। ফুরফুর করে বাতাস বইছিল। বাগানের গাছের পাতাগুলো নৈসর্গিক আনন্দযজ্ঞে যোগদান করে ঝিরিঝিরি শব্দে কী যেন বলতে চাইছিল। সব মিলিয়ে সন্ধ্যার সেই নৈসর্গিক রূপ ছিল বড়ো চমৎকার।

৮। "আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?”—কাকে এ কথা বলা হয়েছে? তাকে এ কথা বলা হয়েছে কেন? ১+২

কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশে জগদীশবাবুকে উদ্দেশ করা হয়েছে।

হরিদা সন্ন্যাসী বিরাগীর ছদ্মবেশে সম্ভ্রান্ত জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হলে, পুণ্যলোভী জগদীশবাবু বিরাগী সন্ন্যাসীর ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ এবং ভক্তিতে গদগদ হন, কিন্তু তাকে বারান্দার উপর থেকেই আমন্ত্রণ জানান। প্রবল ধনসম্পদের অধিকারী জগদীশবাবু সম্পদের অহংকার ও লোভে মত্ত, অর্থের মোহে তিনি এতটাই আচ্ছন্ন যে, সাধারণ মানবিক আচরণও তিনি ভুলে যান। সন্ন্যাসী বিরাগীর ছদ্মবেশী হরিদা, জগদীশবাবুর এই অহংবোধকে আঘাত করে তার চৈতন্যোদয়ের উদ্দেশ্যে উদ্ধৃত প্রশ্নটি করেন।

৯। "আমার বুকের ভিতরেই যে সব তীর্থ।”-কে, কাকে এ কথা বলেন? বক্তা কীভাবে বিত্তের মোহকে তুচ্ছ করেছেন? ১+২

সুবোধ ঘোষের লেখা 'বহুরূপী' গল্পে বর্ণিত বিরাগী ছদ্মবেশধারী হরিদা জগদীশবাবুকে এ কথা বলেছেন।

হরিদা পেশাগতভাবে বহুরূপী। জীবনের অভাব মেটাতে সমাজের বিত্তবান মানুষ জগদীশবাবুকে সে বহুরূপী সাজ দেখাবে বলে মনস্থ করে। সেইমতো সন্ন্যাসী বিরাগীর বেশে এক সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতেও যান। সেখানে জগদীশবাবু তাকে একশো এক টাকা প্রদান করতে চাইলে > শিল্পের প্রতি নিষ্ঠায় তিনি সন্ন্যাসী চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। বিরাগী চরিত্রটির সন্ন্যাসধর্ম হরিদাকে আচ্ছন্ন করায় তিনি অনায়াসে বিত্তের মোহ তুচ্ছ করেন।

১০। "তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়"-'ঢং' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কীসে ঢং নষ্ট হয়ে যাবে? (মাধ্যমিক, ২০২৩) ১+২

সুবোধ ঘোষের 'বহুরূপী' গল্প থেকে উদ্ধৃত অংশটিতে 'ঢং' বলতে হরিদার অভিনয়সত্তাকে বোঝানো হয়েছে।

শহরের ধনী ব্যক্তি জগদীশবাবুর বাড়ি 'জবর খেলা' দেখাতে গিয়ে বহুরূপী হরিদা বিরাগী সন্ন্যাসী সেজেছিলেন। ভক্ত জগদীশবাবু বিদায়বেলায় তাঁর হাতে প্রণামিস্বরূপ একশো এক টাকা নিয়ে সাধলেও হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করেন। দরিদ্র বহুরূপী হরিদা যথার্থ শিল্পীসুলভ মর্যাদার সঙ্গে তার এই আচরণের কারণ হিসেবে বলেন যে, বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে তিনি কীভাবে টাকা স্পর্শ করবেন। তাতে তাঁর শিল্পগুণ নষ্ট হয়ে যায়।

১ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

১। "আক্ষেপ করেন হরিদা”-হরিদার আক্ষেপের কারণ কী? (মাধ্যমিক, ২০২৩)

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত 'বহুরূপী' গল্পে বর্ণিত জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীর মাহাত্ম্য শুনে হরিদা তার পায়ের ধুলো নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্ন্যাসী বিদায় নেওয়ায় তার ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই তিনি আক্ষেপ করেছেন।

২। "কিন্তু ওই ধরনের কাজ হরিদার জীবনের পছন্দই নয়।” -কী ধরনের কাজ হরিদার অপছন্দ? (মাধ্যমিক, ২০২২)

ঘড়ির কাঁটার সময় বেঁধে, নিয়ম করে রোজ একই জীবিকার কাজ করে যাওয়া হরিদার পছন্দ নয়।

৩। "হরিদার জীবন এইরকম বহুরূপের খেলা দেখিয়েই একরকম চলে যাচ্ছে"- কীরকম খেলা দেখিয়ে হরিদার জীবন চলে যাচ্ছে? (মাধ্যমিক, ২০১৮)

অথবা, 

"এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।"- 'বহুরূপী' গল্প থেকে হরিদার কয়েকটি বহুরূপী রূপের উল্লেখ করো।

বহুরূপী হরিদার জীবন কখনও উন্মাদ, কখনও রূপসি বাইজি, কখনও পুলিশ অথবা কাপালিক, বুড়ো কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব, পুলিশ, সন্ন্যাসী বিরাগী প্রভৃতি বিভিন্ন রূপের খেলা দেখিয়েই একরকম চলে যাচ্ছে।

৪। মাস্টারমশাই একটুও রাগ করেননি। বরং একটু তারিফই করলেন"-'তারিফ' করার কারণ কী? (মাধ্যমিক, ২০২২) 

মাস্টারমশাই যখন জানতে পারলেন, যে পুলিশকে তিনি আট আনা ঘুষ দিয়েছেন তিনি আদতে পুলিশ নন, হরি বহুরুপী; তখন তিনি একটুও রাগ করেননি বরং তারিফ করেছিলেন। কারণ বহুরুপী হরির পুলিশ সাজ চমৎকার লেগেছিল তাঁর।

আরো জানতে আমাদের সঙ্গে থাকুন : www.wblearn.in